বলিউডের পর্দায় যখন নায়িকারা নিজেদের রূপের জাদুতে দর্শককে মুগ্ধ করতেন, ঠিক তখনই একটি চরিত্র পর্দার কোণ থেকে এসে পুরো গল্পটাকে এক অন্যরকম মাত্রা দিয়ে দিত। সেই চরিত্রটি মাঝে মাঝে হাসির রঙ নিয়ে আসত, মাঝে মাঝে আবার অশ্রু। আর এই চরিত্রগুলোর পেছনে যে অভিনেত্রীর অসাধারণ কাজ ছিল, তিনি হলেন অরুণা ইরানি। তাঁর নাম হয়তো মেরুদণ্ডের মতো সিনেমার পোস্টারে জায়গা করে নেয়নি, কিন্তু তাঁর অভিনয় ছিল সেই মেরুদণ্ড, যেটি ছাড়া অনেক সিনেমার গঠন ভেঙে পড়ত।
অরুণা ইরানির ক্যারিয়ারটা এক অবিশ্বাস্য বৈচিত্র্যের গল্প। তিনি একইভাবে খলনায়িকা, কৌতুকাভিনেত্রী, চরিত্র অভিনেত্রী এবং মা-র ভূমিকায় নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন। তাঁর অভিনয়ের প্রধান শক্তি ছিল তাঁর চোখ। কথা না বললেও, সেই চোখগুলো অনেক কিছু বলত পারত। শুধু হাসি বা কান্না নয়, বিরক্তি, ক্ষোভ, স্নেহ আর ভালোবাসা—সব কিছুই তিনি তাঁর চোখের ইশারায় ফুটিয়ে তুলতে পারতেন। এই দক্ষতাটাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছিল।
তাঁর কিছু চরিত্র এমন আছে, যেগুলো ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে অমলিন হয়ে আছে। ‘কুর্বানী’ ছবিতে তাঁর অভিনীত ফেমিনা চরিত্রটি ছিল এক অসাধারণ সম্মিলন—সেখানে ছিল শক্তি, আবেদন এবং এক ধরনের রহস্যময়তা। তিনি এই চরিত্রে এমনভাবে ঢুকে পড়েছিলেন যে, দর্শক তাঁকে শুধু একটি সহায়ক চরিত্র হিসেবে দেখেনি, বরং একটি শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে মেনে নিয়েছিল। একইভাবে, বিভিন্ন ছবিতে তাঁর কৌতুকাভিনয়ের ছোঁয়া এতটাই স্বাভাবিক ছিল যে, মনে হতো সেটি তাঁর নিজের স্বভাবেরই অংশ। তিনি জোর করে হাসানোর চেষ্টা করতেন না, বরং পরিস্থিতির মধ্য থেকেই হাসি তুলে আনতেন।
অরুণা ইরানির সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো তিনি কখনোই নিজেকে কোনো একটি ছাঁচে ফেলে দেননি। যখন নায়িকারা বয়স বাড়ার সাথে সাথে চলচ্চিত্র জগৎ থেকে বিদায় নিতে শুরু করেন, তখন অরুণা ইরানি নিজেকে এক নতুন রূপে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি মা, দিদা, মাসি—এই সব চরিত্রেও সমান তৎপরতা দিয়ে কাজ করেছেন। তাঁর অভিনীত মা-র চরিত্রগুলো ছিল বাস্তবসম্মত। সেখানে ছিল স্নেহের পাশাপাশি সন্তানদের জন্য উদ্বেগ, মাঝে মাঝে রাগ এবং এক অদম্য শক্তি। তিনি সেই “ফিল্মি মা” এর ছাপ ভেঙে দিয়েছিলেন, যিনি শুধু আশীর্বাদ দিতেন বা কাঁদতেন। তাঁর মা-রা ছিলেন মানুষ, যাঁদের নিজস্ব সংগ্রাম ও স্বপ্ন ছিল।
তবে, অরুণা ইরানির অবদানকে কেবল তাঁর অভিনয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না। তিনি একজন সফল প্রযোজকও ছিলেন। একজন মহিলা হয়ে সেই সময়ে প্রযোজনার জগতে পা রাখা এবং সফলতা অর্জন করা সত্যিই এক বিরল ঘটনা। এটি তাঁর ব্যবসায়িক প্রজ্ঞা এবং শিল্পের প্রতি তাঁর গভীর নিষ্ঠারই প্রমাণ। তিনি জানতেন কোন গল্প দর্শকের কাছে পৌঁছাবে এবং কোনটি নয়। এই বোঝাপড়াই তাঁকে পর্দার পেছনেও একজন ক্ষমতাশালী ব্যক্তিত্ব করে তুলেছিল।
আজকের দিনে যখন আমরা শিল্পীদের তালিকা তৈরি করি, তখন প্রায়ই তাঁর নামটি ভুলে যাই। কিন্তু যদি কোনো ছবি থেকে তাঁর দৃশ্যগুলো বাদ দিয়ে দেওয়া হয়, তবে সেই ছবির সৌন্দর্য অনেকটাই কমে যাবে। তিনি ছিলেন সেই মশলা, যেটি না থাকলে খাবারের স্বাদ অসম্পূর্ণ। তিনি ছিলেন সেই সুর, যেটি গানের মধ্যে মিশে গিয়ে তাকে পূর্ণতা দিত।
অরুণা ইরানির কাহিনী আমাদের শেখায় যে, সিনেমায় সাফল্য শুধু প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেই আসে না। একজন শিল্পী যদি নিজের কাজের প্রতি সত্যিকারের নিষ্ঠাবান থাকেন এবং প্রতিটি সুযোগকে সাদরে গ্রহণ করেন, তবে তিনিও ইতিহাসের পাতায় নিজের জায়গা করে নিতে পারেন। তিনি হয়তো সবচেয়ে জোরালো আলোর মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলেন না, কিন্তু তিনি ছিলেন সেই আলোর উৎস, যে আলো অনেক সময় অন্ধকারকে ভেদ করে সত্যিকারের গল্পকে প্রকাশ করে দিত। তাঁর অভিনয়ের মধ্যে একটি বিনয়ী কিন্তু অটল শক্তি ছিল, যেটি দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলে যায়।
সিনেমার সেই অপরিচিত পরিচিতা: অরুণা ইরানির নীরব কিন্তু দৃঢ় পদচিহ্ন
Source: HotArticle
Original link: https://www.hotarticle24.com/ngioyr36