সমাজের কোনো কাজই এককভাবে প্রশাসন বা কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে করা সম্ভব নয়। উন্নয়ন, শৃঙ্খলা, স্বাস্থ্যসেবা বা দুর্যোগ মোকাবিলা—সবখানেই সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রয়োজন। যাঁরা পারিশ্রমিকের আশা না করে নিজের সময় আর শ্রম দিয়ে নাগরিক জীবনের এসব কাজে এগিয়ে আসেন, তাঁদেরই বলা হয় সিভিক ভলান্টিয়ার। বাংলা পরিভাষায় এঁরা নাগরিক স্বেচ্ছাসেবক নামে পরিচিত।
বাংলাদেশে সিভিক ভলান্টিয়ার শব্দটি বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়েছে নির্বাচন কমিশনের সিভিক ভলান্টিয়ার কর্মসূচির মাধ্যমে। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে এই প্রোগ্রাম চালু হলে দেশজুড়ে তরুণদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পড়ে। তবে এর বাইরেও সিটি কর্পোরেশন, জেলা প্রশাসন এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের আওতায় অনেক মানুষ নাগরিক স্বেচ্ছাসেবকের ভূমিকা পালন করছেন।
সিভিক ভলান্টিয়ার কী করেন?
একজন সিভিক ভলান্টিয়ারের কাজের পরিধি নির্ভর করে কোন প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তিনি কাজ করছেন, সেই ওপর। সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁদের প্রধান দায়িত্বগুলোকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়।
নির্বাচনী কাজে সহায়তা: ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায়, ভোটারদের সারিবদ্ধভাবে পরিচালনায় এবং প্রতিবন্ধী বা বয়স্ক ভোটারদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতায় সিভিক ভলান্টিয়াররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কেন্দ্রের বাইরে ভোটারদের তথ্য দেওয়া, প্রয়োজনীয় নথিপত্র পরীক্ষা করা থেকে শুরু করে ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ শান্ত রাখার কাজটিও তাঁরাই করেন।
নগর সেবার অংশ হওয়া: সিটি কর্পোরেশনের অধীনে মশক নিধন, সড়ক ও ড্রেন পরিষ্কার, গাছ লাগানো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় জনসচেতনতা তৈরি—এসব নিয়মিত কাজে সিভিক ভলান্টিয়াররা যুক্ত থাকেন। কোনো এলাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লে জরুরি ভিত্তিতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে এঁরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বার্তা পৌঁছে দেন।
দুর্যোগে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম: বন্যা, ঘূর্ণিঝড় কিংবা ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে প্রশাসনের পাশে থেকে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া, উদ্ধারকাজে সহায়তা করা এবং আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে সহযোগিতা করা সিভিক ভলান্টিয়ারদের অন্যতম বড় দায়িত্ব।
স্বাস্থ্য ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি: টিকাদান ক্যাম্প, রক্তদান শিবির, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সচেতনতামূলক সভা আয়োজনে এঁরা সরাসরি অংশ নেন। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করেন।
পাশাপাশি মহাসড়কে দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা রক্ষা, জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠান পরিচালনা—এ ধরনের আরও অনেক কাজে সিভিক ভলান্টিয়ারদের দেখা যায়। প্রশাসন আর সাধারণ মানুষের মধ্যে যোগাযোগের সেতু হিসেবেও কাজ করেন তাঁরা।
যোগ্যতা কেমন হওয়া প্রয়োজন?
সিভিক ভলান্টিয়ার হওয়ার জন্য কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে স্নাতক বা বিশেষ ডিগ্রির প্রয়োজন হয় না। সাধারণত যে শর্তগুলো দেখা হয়—
- বয়স সাধারণত ১৮ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে হতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে এ সীমা শিথিল করা হয়।
- ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে এসএসসি পাস অনেক জায়গায় চাওয়া হয়, তবে এলাকাভেদে ও কাজের ধরনভেদে এই শর্ত ভিন্ন হতে পারে।
- প্রার্থীকে সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হয় এবং ভোটার তালিকায় নাম থাকতে হয়।
- ভালো শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য থাকা জরুরি। কারণ দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে কাজ করা কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে ছুটে যাওয়ার মতো কাজ প্রায়ই করতে হয়।
- সমাজসেবার প্রতি আগ্রহ, সৎ আচরণ এবং দলগতভাবে কাজ করার মানসিকতা থাকা আবশ্যক।
বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই নিয়োগের পর স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। নির্বাচনী দায়িত্বের আগে প্রার্থীদের যেমন বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তেমনি দুর্যোগ বা স্বাস্থ্য কর্মসূচির ক্ষেত্রেও কাজ শুরুর আগে হাতে-কলমে শেখানো হয়।
যেভাবে সিভিক ভলান্টিয়ার হিসেবে যুক্ত হবেন
যাঁরা সিভিক ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করতে চান, তাঁরা প্রথমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মসূচির খোঁজ রাখতে পারেন। নির্বাচন কমিশন প্রতি নির্বাচনের আগে অনলাইন ও স্থানীয় মাধ্যমে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। সিটি কর্পোরেশন, উপজেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থাও মাঝেমধ্যে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগের ঘোষণা দেয়।
আবেদনের সময় জাতীয় পরিচয়পত্র, শিক্ষাগত সনদ, ছবি এবং স্থানীয় resident শংসাপত্র বা চরিত্রপত্র লাগতে পারে। আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের পর যাঁরা বাছাই হন, তাঁদের একটি নির্দিষ্ট সময়ের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে দায়িত্ব অনুযায়ী বিভিন্ন এলাকায় বা কেন্দ্রে নিয়োগ দেওয়া হয়। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে নোটিশ বোর্ড বা ওয়েবসাইটে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করা হয় বলে নিয়মিত চোখ রাখাও জরুরি।
সিভিক ভলান্টিয়ার হওয়ার সুবিধা
পারিশ্রমিকের বাইরেও সিভিক ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করার কিছু উল্লেখযোগ্য দিক আছে।
সরকারি নথিভুক্ত অভিজ্ঞতা: কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের আওতায় কাজ করলে পরবর্তী সময়ে চাকরির বাজারে সেই অভিজ্ঞতা ভীষণ কাজে লাগে। বিশেষ করে সরকারি চাকরির আবেদনে স্বেচ্ছাসেবী অভিজ্ঞতা প্রায়ই প্রাধান্য পায়।
দক্ষতা অর্জন: যোগাযোগ, নেতৃত্ব, সংকট মোকাবিলা ও দলগত কাজ—সিভিক ভলান্টিয়ারিং হাতেকলমে এই দক্ষতাগুলো শেখায়। ব্যক্তিগত আত্মবিশ্বাসও বেড়ে যায় অনেকখানি।
সমাজে সম্মান: নিজ এলাকার মানুষের জন্য সময় দেওয়ার ফলে স্থানীয় পর্যায়ে একজন স্বেচ্ছাসেবক স্বাভাবিকভাবেই মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করেন।
নেটওয়ার্কিং: প্রশাসনের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এই যোগাযোগ ভবিষ্যতে নানা ক্ষেত্রে সহায়ক হয়।
স্বেচ্ছাসেবী কাজের জন্য অনেক প্রতিষ্ঠান সম্মানী বা ভাতা প্রদান করে থাকে। তবে এর পরিমাণ সাধারণত খুব বেশি নয়। তাই যাঁরা বড় আয়ের আশায় এ কাজে আসেন, তাঁদের ধারণা বদলে নেওয়া ভালো। সিভিক ভলান্টিয়ারিং মূলত ত্যাগ আর ভালোবাসার জায়গা, পেশা নয়।
যে চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি হন স্বেচ্ছাসেবকরা
এই কাজে যুক্ত হতে চাইলে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও মাথায় রাখা দরকার।
নিয়মিত আয়ের সুযোগ কম: বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি পার্টটাইম বা সাময়িক কাজ। নির্বাচন বা নির্দিষ্ট কোনো প্রকল্প শেষ হলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়।
অনিয়মিত সময়: জরুরি পরিস্থিতিতে যেকোনো সময় ডাক আসতে পারে। দুর্যোগের সময় তো একটানা দিন-রাত কাজ করতে হয়।
শারীরিক পরিশ্রম: রোদে-বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে কাজ, জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ, ভারী জিনিসপত্র বহন—সব মিলিয়ে ব্যস্ততা বেশ কষ্টসাধ্য হতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ঝুঁকি: নির্বাচনী সহিংসতা বা ভাঙচুরের সময় শান্তি বজায় রাখতে গিয়ে স্বেচ্ছাসেবকদের উপর চাপ পড়তে পারে। দুর্যোগের সময় নিজের জীবন বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।
নিরুৎসাহিত হওয়ার মুহূর্ত: প্রশাসনিক জটিলতা বা মানুষের অবজ্ঞাপূর্ণ মনোভাবের কারণে কখনো কখনো কাজে উৎসাহ কমে যেতে পারে। দীর্ঘদিন কোনো স্বীকৃতি না পেলে হতাশাও চেপে বসতে পারে।
সমাজের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
একটি সমাজের ভিত কতটা মজবুত, সেটা ওই সমাজের নাগরিকদের নিজেদের বিষয়ে আগ্রহ থেকে বোঝা যায়। সিভিক ভলান্টিয়াররা নাগরিকের সেই আগ্রহকে কাজে রূপ দেন। প্রশাসনের পক্ষে সব মানুষ পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব হয় না; সিভিক ভলান্টিয়াররাই সেই শূন্যস্থান পূরণ করেন।
তরুণরা এই কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত হলে যেমন নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে পারেন, তেমনি দেশের প্রতি দায়িত্ববোধও গড়ে ওঠে। ছোট ছোট কাজ—একজন পথচারীকে পথ দেখানো, ভোটকেন্দ্রে একজন বয়স্ক নাগরিককে সহায়তা করা, রাস্তায় সচেতনতা মূলক লিফলেট বিতরণ—এসব কাজ একদিনে বিশাল পরিবর্তন আনে না ঠিকই, কিন্তু সমাজের মানুষের মনে আস্থার জায়গা তৈরি করে।
সিভিক ভলান্টিয়ারিংকে তাই নিছক একটি চাকরি বা এককালীন কার্যক্রম মনে করার সুযোগ নেই। এটি একধরনের দায়িত্ববোধ, নিজের এলাকা ও মানুষের প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। যে সমাজে যত বেশি নাগরিক এরকম স্বেচ্ছাসেবী ভূমিকায় এগিয়ে আসেন, সে সমাজ সংকটে পড়লেও সবচেয়ে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায়।
আপনি যদি সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ বোধ করেন এবং কিছু মানুষের কাজে আসতে চান, তবে সিভিক ভলান্টিয়ার হিসেবে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করুন। বয়স বা পেশা এখানে বড় বাধা নয়; দরকার শুধু আন্তরিক ইচ্ছা। একটু সময় ব্যয় করুন আর দেশের কোনো এক কোণে আলোর বাতি হয়ে জ্বলুন।
সিভিক ভলান্টিয়ার কী? কাজ, যোগ্যতা ও যুক্ত হওয়ার পদ্ধতি
Source: HotArticle
Original link: https://www.hotarticle24.com/5yjofrj5