শহরে বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা পড়লে অনেকেই জানালার কাছে চলে যান। ছবি তোলেন, চায়ের কাপ হাতে বসে থাকেন, কেউ কেউ পুরনো গান ধরেন। বাংলা ভাষায় বর্ষা নিয়ে এত কবিতা, এত সুর, এত স্মৃতি জমে আছে — তার বড় অংশটা এই প্রথম দিনের বৃষ্টির ঋণ।
কিন্তু সেই একই বৃষ্টি যদি টানা চার দিন নামে, তখন সেই মানুষটিই ঘর থেকে বেরিয়ে সবার আগে দেখে নেন পাড়ার ড্রেনটা উপচেছে কি না, রাস্তায় হাঁটু অবধি জল জমেছে কি না। একই আকাশ, একই জল — অথচ অনুভূতিটা রাতারাতি বদলে যায়।
বৃষ্টি বদলায় না। বদলায় আমাদের অবস্থান, আমাদের প্রয়োজন, আর বৃষ্টির সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা।
প্রথম দিন আর সপ্তম দিন
ভারী বৃষ্টির একটা নির্দিষ্ট জীবনচক্র আছে। প্রথম দিনটা উদযাপনের। ধুলো ধুয়ে যায়, বাতাস ঠান্ডা হয়, মাটির গন্ধে ভরে ওঠে চারপাশ। মজার বিষয় হলো, সেই গন্ধটা আসলে মাটির নয় — মাটিতে থাকা কিছু অণুজীব বৃষ্টির জলে সক্রিয় হয়ে একটা যৌগ ছড়ায়, আর আমাদের নাক সেটাকেই "মাটির গন্ধ" বলে চিনে নেয়। শহরে অবশ্য সেই গন্ধের সঙ্গে রাস্তার ধুলো, তেল আর ধোঁয়ার ভাগও জুটে যায়।
দ্বিতীয় দিনে মানুষ ছাতা বের করে। তৃতীয় দিনে ভেজা জামা শুকোয় না, দেয়ালে ছোপ পড়ে, মশার সংখ্যা বাড়ে। সপ্তম দিনে বৃষ্টি আর আবহাওয়া নয়, একটা ব্যবস্থাপনার সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
এই সরল সত্যটা বারবার ভুলে যাই। আমরা বর্ষাকে দেখি ঋতু হিসেবে, গান হিসেবে, ছবির ফ্রেমে বন্দি করে রাখতে ভালোবাসি। অথচ যাঁদের জীবন সরাসরি বৃষ্টির উপর নির্ভর করে, তাঁদের কাছে এটা কখনোই শুধু আবেগের বিষয় নয়।
যাঁদের কাছে বৃষ্টি মানে হিসাব
ভারী বৃষ্টির সবচেয়ে বড় পাওনাদার কৃষি। রোপণের সময় জলের অভাব মেটায় বৃষ্টি, খরার বছর বাঁচায় ফসল। কিন্তু এই হিসাবটা কখনোই নিরাপদ নয়। বেশি হয়ে গেলেই ধান ডুবে যায়, সবজি খেত পচে যায়, যে মাটি রোদে ফেটে যাচ্ছিল সেটাই আবার জলে ভরে গিয়ে বীজ নষ্ট করে দেয়।
একই জিনিস দুই দিক থেকে কাজ করে। বৃষ্টি যেখানে জন্ম দেয়, সেখানে ক্ষতিও করে। কারণটা বৃষ্টি নয়, কারণটা পরিমাণ আর সময়।
শহরের মানুষ সহজে ভুলে যায়, বর্ষার প্রতিটি দিন সবার জন্য সমান নয়। রিকশাচালক, ফেরিওয়ালা, নির্মাণশ্রমিক, দিনমজুর — এঁদের কাছে বৃষ্টির দিন মানে আয় বন্ধ, বাড়তি খরচ, ভেজা কাপড়ে ঘরে ফেরা। ছাতা একটু আড়াল দেয়, জলে ডুবে থাকা রাস্তাটা আড়াল হয় না। অথচ বৃষ্টি নিয়ে লেখা প্রতিটি রোমান্টিক লেখায় এই মানুষগুলো সাধারণত অনুপস্থিত থাকেন।
শহরের বৃষ্টি নামে সবার উপর, জল জমে কিছু জায়গায়
শহরে বৃষ্টি একটা অদ্ভুত কাজ করে — সে সবার মাথার উপরে সমানভাবে পড়ে, কিন্তু জল জমে অসমভাবে। যে পাড়া উঁচুতে, যেখানে নালা সচল, সেখানে ঘণ্টা দুয়েকেই পানি নেমে যায়। যে পাড়া নিচুতে, যে খাল ভরাট হয়ে বাড়িঘর হয়েছে, সেখানে পানি যায় না, কারণ নিকাশের কোনো পথই আর অবশিষ্ট নেই।
অর্থাৎ বন্যার ক্ষতিটা আগে বুঝে নেওয়া যায়, যদি শহরের নকশার দিকে তাকানো যায়। কোন খাল রক্ষা করা হলো আর কোনটা ভরাট হয়ে গেল, কোন নালা পরিষ্কার রাখা হলো আর কোনটা বছরের পর বছর বন্ধ পড়ে রইল — এগুলো কোনো আকস্মিক দুর্যোগ নয়, এগুলো সিদ্ধান্ত।
ভারী বৃষ্টির সঙ্গে তাই দুটো ভিন্ন অভিজ্ঞতা জড়িয়ে থাকে। একজন ভাবেন, আজ অফিস যাওয়া হলো না। আরেকজন ভাবেন, আজ ঘরটা রক্ষা করা যাবে কি না।
পাহাড়ি এলাকায় হিসাবটা আরও কঠিন। টানা ভারী বৃষ্টিতে ঢালে মাটি আলগা হয়, পাথর আর কাদা নেমে আসে; যেখানে জঙ্গল কেটে ফেলা হয়েছে, সেখানে ঝুঁকিটা বেড়ে যায়। বৃষ্টির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেই, কিন্তু জঙ্গল আর ঢালের ব্যবহার ঠিক থাকলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অনেকটাই কমে।
যে বৃষ্টি নিয়ম মেনে নামত
জলবায়ু পরিবর্তনের আলোচনায় বারবার একটা কথা ফিরে আসে — বৃষ্টি কমছে না, বৃষ্টির ধরন বদলে যাচ্ছে। মাসজুড়ে সমান সমান বৃষ্টির বদলে vaak কম দিনে জমিয়ে বৃষ্টি, আবার পাশে দীর্ঘ শুকনো দিন।
এই বদলের পরিণতি জায়গায় জায়গায় আলাদা, কিন্তু যুক্তিটা একই। কিছু দিন শুকনো থাকলে মাটি শক্ত হয়ে বসে, তখন হঠাৎ নামা ভারী বৃষ্টির অনেকটা অংশ মাটিতে ঢোকে না, বয়ে যায়। নদী হঠাৎ ফুলে ওঠে, শহরের নালা সামলাতে পারে না, ক্ষেত জলের নিচে চলে যায়।
আগের প্রজন্ম বর্ষাকে কিছুটা হলেও পরিকল্পনার মতো ব্যবহার করতে পারত — কোন মাসে বৃষ্টি আসবে, তার একটা আন্দাজ ছিল। সেই আন্দাজটাই আজ দুর্বল হয়ে পড়েছে। আর অনিশ্চয়তা ঠিক সেই জিনিস, যেটা কৃষকের সবচেয়ে বড় শত্রু এবং শহর-পরিকল্পনাকারীরও।
বৃষ্টির সঙ্গে বাঁচতে শেখা
ভারী বৃষ্টি ঠেকানো যায় না, বন্ধ করাও যায় না, আর দরকারও নেই। প্রশ্নটা হলো, আমরা নিজেদের কতটা প্রস্তুত রাখি।
যা করা যায়, তার কঠিন অংশ কম, লাগাতার অংশ বেশি। নালা ও খাল পরিষ্কার রাখা, বর্ষার আগেই সেটা সেরে ফেলা। বাড়ির ছাদের পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা, যাতে বৃষ্টির জল আক্ষরিক অর্থেই নিষ্কাশন ব্যবস্থার বোঝা না বাড়ায়। হাওয়া অফিসের আগাম বার্তা যে গ্রামে পৌঁছায় সেটা নিশ্চিত করা, যাতে ফসল আর গবাদি পশু আগেই সরিয়ে নেওয়া যায়। আর শহরে বসে তাকানো — আমাদের পাড়ায় জল কেন জমল, সেটার উত্তর খোঁজা।
এসব আর দশটা কাজের মতো চেনা, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এগুলোই সবচেয়ে অবহেলিত, কারণ ধৈর্য ধরে করার কাজগুলো কখনো ছবির মতো সুন্দর দেখায় না।
আর একটা কথা মনে রাখা দরকার। ভারী বৃষ্টির দিনে খবরের শিরোনাম হয় জলমগ্ন রাস্তা, বন্ধ সড়ক, ক্ষতিগ্রস্ত ফসল। কিন্তু তার পাশাপাশি একটা সত্যি থাকে — এই বৃষ্টিই আগামী মৌসুমের জন্য নদী ভরায়, মাটি তৈরি করে। আমরা যাকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলি, সেই একই বৃষ্টি আমাদের খাবারের হিসাবটাও লিখে দেয়।
তাই পরের বছর বর্ষার প্রথম ফোঁটা যখন ছাদে পড়বে, লোকে আবার জানালার কাছে যাবে — এটা নিশ্চিত। শুধু কতদিন পর্যন্ত ওরা সেখানে দাঁড়িয়ে থাকবে, সেটা নির্ভর করে বৃষ্টির উপরে নয়, আমাদের নিজেদের প্রস্তুতির উপরে।